-67e29038edee8-67eea4327210f.jpg)
ছবি: সংগৃহীত
গত পর্বে আমরা দেখেছি সিসন এবং রোজ তাঁদের ‘War and Secession: Pakistan, India, and the Creation of Bangladesh’ বইয়ে বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে কি লিখেছেন। এই পর্বে আমরা গ্যারি জে ব্যাসের ‘The Blood Telegram: Nixon, Kissinger and a forgotten genocide’ বিশ্লেষণ করি। যুদ্ধের আগে পাকিস্তানের দুই অঙ্গের কুশীলবদের কার্যকলাপের পরিবর্তে, প্রিন্সটন অধ্যাপক ব্যাসের মনোযোগ ছিল কীভাবে মার্কিন ও ভারতীয় সরকার — ‘বিশ্বের দুই মহান গণতন্ত্র’ — বাংলাদেশ সংকট মোকাবিলা করেছিল ।
২০১৩ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে ব্যাস নিশ্চিতভাবেই সিসন ও রোজের মতো একই মাত্রায় সাক্ষাৎকারের উপর নির্ভর করতে পারেননি। বরং, তিনি গবেষণা করেছেন আমেরিকান আর্কাইভাল উপকরণের উপর ভিত্তি করে, বিশেষত: ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড রচিত সরকারি প্রতিবেদন — সেই প্রখ্যাত টেলিগ্রাম; এবং রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার মধ্যে হোয়াইট হাউসের কথোপকথনের টেপ।
নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার— কৌশলী , শীতল, কঠোর ভূ-রাজনৈতিক গণনার কথিত মাস্টারমাইন্ড — ব্যাসের বর্ণনায় এই মার্কিনি যুগল যথেষ্ঠই খারাপভাবে উঠে এসেছে। এমন নয় যে হোয়াইট হাউসের ক্ষমতাসীনরা অবহিত ছিলেন না বাংলাদেশে কি হচ্ছে— তারা জানতেন, কারণ ব্লাড এবং তার সহকর্মীরা জোরালোভাবে এবং বীরত্বপূর্ণভাবে (ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের উপর এর প্রভাবের আলোকে) জানিয়েছিলেন কি হচ্ছিলো। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তার উপদেষ্টা সেই অপ্রিয় সত্যগুলি শোনেননি। এর পরিবর্তে, নিক্সন ও কিসিঞ্জার ‘জেনে-শুনে মার্কিন আইন ভঙ্গ করেন’ — প্রমাণ: টেপগুলি—পাকিস্তানি নৃশংসতা সহায়তা করার জন্য।
এমনও নয় যে তাদের সীমিত বিকল্প ছিল— ব্যাসের মতে, রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে বল প্রয়োগের অর্থহীনতা অথবা ভারতের বিরুদ্ধে একটি অজেয় যুদ্ধ শুরু না করার বিষয়ে পাকিস্তানি জেনারেলদের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। গণহত্যা এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের মানবিক বিপর্যয় না হয় এক কথা, কিন্তু রিয়েলপলিটিকক্স দৃষ্টিকোণ থেকেও তো ১৯৭১ এর যুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিপর্যয়কর ফলাফলে শেষ হয়: তার একটি প্রধাণ মিত্র একটি সোভিয়েত সমর্থিত প্রতিপক্ষ দ্বারা খণ্ডিত হয়। গ্রেট গেম এর গ্র্যান্ডমাস্টাররা কেন এবং কীভাবে এটি ঘটতে দিয়েছিল? পাকিস্তানের সামরিক পরাজয় কি চীনের সাথে আমেরিকার পুনর্মিলনের মূল্য ছিল?
ব্যাস চীন সংযোগের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন — যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ বাংলার জলাভূমির হত্যাক্ষেত্র ও শরণার্থী শিবিরে মৃত্যুর মুখোমুখি, কিসিঞ্জার গণপ্রজাতন্ত্রের সঙ্গে তার গোপন আলোচনার জন্য পাকিস্তানকে একটি গোপন ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ব্যাসের মতে, যে নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানি জেনারেলদের সংযত করেও গণচীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারত। উদাহরণস্বরূপ, রোমানিয়াও একটি কার্যকর চ্যানেল হতে পারত। আখেরে, নিকোলাই চাউচেস্কু ১৯৬৮ সালে প্রাগ বসন্ত দমন করতে সোভিয়েতদের সঙ্গে যোগ দেননি, তাই চীনের দেয়াল খোলার সঙ্গে সঙ্গে একটি ওয়ারশ প্যাক্ট দেশকে পশ্চিমে ঘুরিয়ে নেওয়া নিক্সন ও কিসিঞ্জারের জন্য তো আরও ভালো বিজয় হত!
হোয়াইট হাউসের কথোপকথনের টেপগুলি থেকে ব্যাস যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যভাবে দেখান যে নিক্সন ও কিসিঞ্জার মোটেই কঠোর হৃদয়, ঠান্ডা মস্তিষ্কের প্রখর যুক্তিবাদী বাস্তববাদী ছিলেন না, বরং তারা পাকিস্তানিদের প্রভাবিত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বড় মেজাজি, আবেগপ্রবণ অস্থির ব্যক্তি হিসেবে। তারা তাড়িত হয়েছিলেন বর্ণবাদ— ‘আমি জানি না কেন নরকে কেউ ঐ ঘৃণ্য দেশে প্রজনন করবে’, নিক্সনের ভারত সম্পর্কে মন্তব্য— এবং নারী বিদ্বেষ — নিক্সন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘বুড়ি কুত্তী’ হিসেবে উল্লেখ করেন — দ্বারা !
নিক্সন ভারতীয়দের প্রচণ্ডভাবে অপছন্দ করতেন, আর পাকিস্তানি জেনারেলদের পছন্দ করতেন তাদের কথিত সততা ও সরলতার জন্য। যুদ্ধের শেষ দিনগুলিতে, কিসিঞ্জারের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে, নিক্সন ভারত আক্রমণ করতে চীনকে চাপ দিয়েছিলেন— একটি বিপজ্জনক প্ররোচনা যা একটি পারমাণবিক যুদ্ধে পর্যবসিত হতে পারত।
হোয়াইট হাউসের এই সাবেক অধিবাসীকে এই পৃষ্ঠাগুলিতে বর্তমান বাসিন্দার মতোই অশ্লীল ও অস্থিরচিত্ত হিসেবে দেখা যায়! আর তার মুখ্য উপদেষ্টা যতটা না ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ের কথিত গ্র্যান্ডমাস্টার, তার থেকে বেশি স্ট্যানলি কুব্রিক এর ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ অনুপ্রাণিত উন্মাদ। নিক্সন ও কিসিঞ্জারের বছরের পর বছর ধরে নিজেদের চারপাশে গড়ে তোলা স্টেটসমেন এর যে শ্রুতি , ব্যাস সেটাকে অনেকটাই ধসিয়ে দিতে সফল হয়েছেন। অবশ্যই, ২০১৩ তে বসে ব্যাসের পক্ষে ট্রাম্প আমল কল্পনাও করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ছায়ায় বসে আমরা যখন নিক্সন প্রশাসনের আচরণ দেখি, প্যাক্স আমেরিকানার নিয়ম-ভিত্তিক কথিত সুবর্ণযুগ সত্যিই কি এতটাই ভালো ছিল যা প্রায়ই বলা হয়?
বইটির ভারতীয় সংস্করণের উপশিরোনাম ‘ইন্ডিয়াস সিক্রেট ওয়ার ইন ইস্ট পাকিস্তান’ হওয়াও বেশ অর্থবহ। বদমেজাজি মার্কিনী নেতৃত্বের স্পষ্ট বিপরীতে, ব্যাসের দৃষ্টিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তার ঘনিষ্ঠ বিশ্বস্তরাই ছিলেন সত্যিকারের ঠান্ডা মাথার রেলপলিটিক মাস্টারমাইন্ড, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় কার্যক্রমকে দেখানো হয়েছিল অর্থ মানবতার সেবা হিসেবে। ইন্দিরা গান্ধীর সরকার সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং ক্রমবর্ধমান চরমপন্থার একটি রাজনৈতিক অগ্নিকুণ্ডে স্থাপিত অকল্পনীয় মাত্রার একটি মানবিক সংকট মোকাবিলা করেছিল, একটি পরিপন্থী আন্তর্জাতিক পরিবেশে—এটি সিসন এবং রোজ থেকে ভালোভাবে বোঝা যায়। ব্যাস আমাদের দেখান যে ভারত শেষ উপায় হিসেবে নয়, বরং পাকিস্তানের সামরিক দমনের প্রথম দিন থেকেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল।
৩ ডিসেম্বর ভারতীয় বিমানঘাঁটিগুলি বোমা হামলা না করলেও ভারত যে পাকিস্তান আক্রমণ করতে পারত, সে কথা বলার মানে এই না যে ভারত একটি বিশাল মানবিক বোঝা বহন করেছিল । ১৯৯০-এর দশকে বলকানের যুদ্ধে পশ্চিমা অংশগ্রহণের পর থেকে মানবিক হস্তক্ষেপের উপর একটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্য উদ্ভূত হয়েছে। সেই সাহিত্যের আলোকে ১৯৭১ সালে ভারতের পদক্ষেপগুলির বিশ্লেষণ একটি আকর্ষণীয় পাঠ হবে।
(চলবে)
জ্যোতি রহমান, অর্থনীতিবিদ
Jyoti Rahman is a Bangladeshi writer. His pieces are archived www.jrahman.substack.com-