
নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদন নিয়ে বেশ চর্চা চলছে। যার মূল বিষয় হলো জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামি এক্সট্রিমিস্টদের উত্থান ঘটছে। বাংলাদেশের সাথে মৌলবাদ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হচ্ছে বিগত তিন দশক ধরেই। ১৯৯১-এ যখন আওয়ামী লীগ পরাজিত হলো নির্বাচনে এবং বিএনপি সরকার গঠন করলো, তখন থেকেই শুরু এই আলাপের। তারপর তো বাড়তে বাড়তে এই জুজুকেই হাসিনা রেজিমের ক্ষমতায় থাকার অবলম্বন হিসেবে দাঁড় করালো বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ান অংশ।
এই অংশটি ইন্ডিয়ার সাথে মিলে বলতে চাইলো, ইন্ডিয়ার আধিপত্যবাদের ছায়া যদি বাংলাদেশের উপর থেকে সরে যায়, তাহলে এদেশে ইসলামি এক্সট্রিমিস্টদের উত্থান ঘটবে। যার কিছু প্রোটো টাইপও দেখানো হলো। পশ্চিমারা তখন ভারতের চোখে দেখতো বাংলাদেশকে, তারাও বিশ্বাস করলো যে, বাংলাদেশ ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত হলে সেখানে এক্সট্রিমিজম শেকড় গাড়বে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন সেই ধারাবাহিকতারই ফল। দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততা থেকে বের হওয়া কঠিন ব্যাপার। এখন আসি এই প্রতিবেদন কারা করেছেন তাদের ব্যাপারে। নিউইয়র্ক টাইমস দুজনের নাম যুক্ত করেছে প্রতিবেদক হিসেবে। একজন ইন্ডিয়ান অন্যজন বাংলাদেশি। যিনি ইন্ডিয়ান তার নামটা বানান বিভ্রাটের ভয়ে ইংরেজিতেই লিখি।
তিনি হলেন, Mujib Mashal এবং তিনি কাজ করেন নিউইয়র্ক টাইমসের সাউথ এশিয়ান ব্যুরো চিফ হিসেবে। তিনি তার নিজের সম্পর্কে লিখেছেন, ‘What I Cover- Based out of New Delhi, I work with a team of dedicated journalists to cover the major developments in India and several of its neighboring countries — Bangladesh, Sri Lanka, Nepal, Bhutan and the Maldives. While my focus remains on the political and geopolitical trends at a time when India is coming into its own as an important international power’, আমার মনে হয় না এরপর তার সম্পর্কে আর কিছু বলতে হবে। তার নিউজ ট্রিটমেন্ট কী হবে তা সহজেই অনুমেয়।
বাংলাদেশের যার নাম রয়েছে তিনি হলেন, Saif Hasnat, বাংলায় কীভাবে লিখেন তা জানি না বলে তার নামও ইংরেজিতেই লিখলাম। এই নামে ফেসবুক প্রোফাইলে যাকে পেলাম তিনিই যদি সেই Saif Hasnat হয়ে থাকেন, তাহলে হয়তো এই নামটা খামোখাই নিউইয়র্ক টাইমস ব্যবহার করেছে। কারণ তিনি লতিফুল ইসলাম শিবলী’র পোস্ট শেয়ার করেছেন। লতিফুল ইসলাম শিবলী হলেন, বিখ্যাত গীতিকবি, লেখক এবং নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক। যার নামের সাথে ইসলামিস্ট ট্যাগ লাগানো আছে। সুতরাং তার পোস্ট যিনি শেয়ার করেছেন, তার পক্ষে বাংলাদেশকে এতটা নেতিবাচক ভাবে তুলে ধরা অনেকটাই অবাক করা সাথে অবিশ্বাসেরও বিষয়।
আমি নিউইয়র্ক টাইমসের ফলোয়ার, পড়ি। সুতরাং এই প্রতিবেদনটাও আমার চোখে পড়েছে এবং পড়েছি। একজন পাঠক সাথে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে একটা নিউজের ট্রিটমেন্ট থেকে সঙ্গতই অনুধাবন করার চেষ্টা করি এর পেছনে আসলে কী আছে। নিউজ বাহাইন্ড নিউজ খোঁজার চেষ্টা করি। চেষ্টা করি যারা প্রতিবেদন করেছেন তাদের চিন্তা সম্পর্কে জানতে, তাদের কাজের ধরণ বুঝতে এবং একই সাথে তাদের স্বার্থের জায়গাটি দেখতে। এখানেও হয়তো কেউ দ্বিমত করবেন, দেখাবেন আগেও তো নিউইয়র্ক টাইমসে বিগত হাসিনা রেজিম নিয়ে নেতিবাচক খবর হয়েছে। প্রতিবেদন হয়েছে জুলাই বিপ্লব নিয়ে। হয়েছে, পরিস্থিতি ডিমান্ড করেছে বলে। সেই খবর বা প্রতিবেদনের সাথে জড়িত ছিল মাধ্যমের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন। কারণ তখন সারাবিশ্বের ফোকাস ছিল হাসিনা বিরোধী মুভমেন্টের উপর। তার উপর ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন সমর্থন। এখন সেই ফোকাসটা নেই। তাই নিউইয়র্ক টাইমস যেমন ক্ষমতার শূন্যতার কথা বলেছে, তেমনি ফোকাস না থাকায় যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তারই সুযোগ নিয়েছেন নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক। না, বহুবচন বললাম না, কারণ বাংলাদেশি সাংবাদিক কতটা কন্ট্রিবিউট করেছেন এই প্রতিবেদনে তা নিয়ে আমার দ্বিধা রয়েছে। যতটা জানি সাংবাদিকতা সম্পর্কে সে অনুযায়ী তিনি হয়তো হিজবুত তাহরির নামক নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিলের বিশদ জানিয়েছেন মাত্র। প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য ফেসবুক প্রোফাইল অনুযায়ী তার হবার কথা নয়। অন্তত পাঞ্চলাইনটা।
আগেই বলেছি বাংলাদেশকে ইসলামি এক্সট্রিমিজমের উর্বর ভূমি হিসেবে প্রমাণ করার মিশন ছিল ভারতের। কারণ তারা তাদের আধিপত্যবাদ টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। আজকে যখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূস চীনে গিয়ে ভারতের সাতরাজ্য নিয়ে কথা বলেন তখন ভারতে তোলপাড় ওঠে। সম্প্রতি চীন সফরের সময় ড. ইউনূস ভারতের সাতরাজ্যকে ‘ল্যান্ড লকড’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ স্থল পরিবেষ্ঠিত। এই সাতরাজ্য দাঁড়াতে পারে আমাদের ভাগের সমুদ্রের উপর নির্ভর করে। আমরা যদি সহায়তা করি তাহলে এই সাতরাজ্য অর্থনৈতিক ভাবে দাঁড়িয়ে যাবে। সেজন্যই ড. ইউনূস বলেছেন সমুদ্রের প্রভুত্ব আমাদের। এ নিয়েই ভারতের থিঙ্ক ট্যাঙ্কার্সদের ধুতি খুলে যাবার মতন অবস্থা। পরিবর্তিত বাংলাদেশকে যেমন হজম করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তেমনি সহ্য করাও অসম্ভব। সুতরাং যে কোনো উপায়ে বাংলাদেশকে ইসলামি এক্সট্রিমিস্টদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে প্রমাণ করা গেলে আবার হয়তো পুরানো রাজত্ব ফিরে পাওয়া যাবে। আবার আধিপত্যবাদের অন্ধকার ছায়ার নিচে যাবে বাংলাদেশ।
অনেকে বাংলা ভাইয়ের উদাহরণ টানেন, জেএমবি’র কথা বলেন। জেএমবির উত্থান পর্ব আমার পাশের জেলা জামালপুরে। অথচ কারা সেই উত্থানপর্বের সাথে জড়িত, আব্দুর রহমান, বাংলা ভাই কাদের আত্মীয় তা শুধু তারা চেপে যান। তারা এক্সট্রিমিজমের উত্থানের কথা বলেন, কিন্তু খোঁজ নেন না কীভাবে, কোথায়, কাদের প্রশ্রয়ে এই আব্দুর রহমান বা বাংলা ভাইদের উত্থান হলো। কাদের প্রজেক্ট ছিল বিএনপিকে ইসলামি এক্সট্রিমিজমের পক্ষশক্তি বানানো। এখনই বা কার প্রজেক্ট বিএনপিকে সেকুলার বানানোর। এসব খোঁজ নেয়ার কেউ নেই। মূল জায়গায় এসে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রায় সময়ই থমকে যায়। কেন যায়, সেই প্রশ্নটা থাকে উত্তরহীন।
কোনো কিছু মাঝখান থেকে শুরু করা কাজের কথা নয়। শুরু করতে হয় গোড়া থেকে। তাই শেকড় খুঁজতে হয়। কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমস সেই শেকড় খোঁজেনি। তারা মূলত ফোকাস করেছে হিজবুত তাহরির’র একটা মিছিলের উপর। তারা খুঁজে দেখেনি হিজবুত তাহরির নয় বাংলাদেশের অনেক দলই খিলাফতের কথা বলে। শাসকদের কথা বলতে উদাহরণ টানে ইসলামের চার খলিফার। এটাই রাজনৈতিক ইসলাম। সারাবিশ্বেই তাই। রাজনৈতিক ইসলামের বয়ান তৈরি হয় চার খলিফার শাসনকালকে ধরে। যাকে ইসলামি খিলাফত বলে। এই খিলাফতের কথা বললেই এক্সট্রিমিস্ট হবে এমন ধারণাটা আসে অজ্ঞতা থেকে। রাজনৈতিক অজ্ঞতা। এই চার খলিফার শাসনকাল অর্থাৎ খিলাফতকে এক্সট্রিমিজম বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে একমাত্র বাংলাদেশ থেকেই। সোকল্ড সেকুলাররা এই কাজটি করেছেন এবং তা ভারতের মদতে। একসময় যেমন ঘরে নামাজ শিক্ষা থাকলেও তাকে জিহাদি বই বলে পুলিশ টেবিলে সাজিয়ে রাখতো।
খলিফা ওমরের শাসনকালকে নজির হিসেবে দেখে পশ্চিমারাও। সুশাসনের নজির। একে যারা এক্সট্রিমিজম বলেন, তাদের উদ্দেশ্য যে খারাপ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। খিলাফতের প্রায়োগিক অর্থ সুশাসন। কিন্তু এ কথা ভারতপন্থী সাংবাদিক কিংবা সেই ঘরানায় যারা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার করেন তাদের বোঝাবে কে। জেগে ঘুমালে জাগানোটা অসম্ভব। ওহ, বলতে ভুলে গেছি, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, এই প্রতিবেদনটা তৈরি করার জন্যই বুঝি হিজবুত তাহরির’র মিছিলটা করানো হয়েছে। আমার এক লেখায় বলেছিলাম, বাংলাদেশের কথিত সেকুলার ও কথিত ইসলামিস্টদের ফান্ডিং এর জায়গাটা একই। বিশ্বাস না হলে সূত্রগুলো জোড়া লাগান, দেখবেন সব মিলে গেছে। দেখবেন তারা একই বৃন্তে দুটি ফুল। বুঝবেন কেন মোদির আগমনে বাংলাদেশ আনরেস্ট হয় আর ভারতে ভোট বাড়ে বিজেপি’র।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন নিয়ে কথা বলছি বলে সেই পুরানো কেচ্ছা গাইবে কেউ। বলবে, যখন পক্ষে বলেছে তখন নিউইয়র্ক টাইমস ভালো ছিল, এখন বিপক্ষে তাই খারাপ। যারা বলবে, তাদের টাইমলাইন ঘেটে দেখবেন জুলাই বিপ্লবে যে তরুণদের তারা গুণগান গাইতো, এখন তাদের সমালোচনায় মুখর। কাজ ফুরালেই পাজি আর কী। এরাই বলবে, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের সমালোচনা করা যাবে না, তারা যা বলেছে সেটাই সহি। কিন্তু আমরা যারা সমালোচনাটা করি, মন্দালোচনা নয়, তারা জানি সমালোচনা কীভাবে জারি রাখতে হয়, করতে হয়। বিপরীতে তারা জানে না সমালোচনাটা মূলত কী। তারা জানে এবং করে শুধু ভালোচনা নয় মন্দালোচনা। এই বাইনারির বাইরে তাদের আর কিছু নেই।