Logo
Logo
×

অভিমত

নির্বাচন ঠেকাতেই কি হঠাৎ ড. ইউনূসের ৫ বছর থাকার দাবি তোলা

Icon

রেদোয়ান রজব

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৫, ০৮:০৮ পিএম

নির্বাচন ঠেকাতেই কি হঠাৎ ড. ইউনূসের ৫ বছর থাকার দাবি তোলা

জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজ শেষে ড. ইউনূস। ছবি: সংগৃহীত

পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, উপপ্রধান উপদেষ্টা বিষয়ে পিনাকী ভট্টাচার্যের আইডিয়াটি রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের ঠান্ডা ঝড় বইয়ে দিয়েছে। সকলেই ভাবতে বসেছেন, এর পেছনে সরকারের কোনো সবুজ সংকেত আছে কিনা। বিশেষ করে, পিনাকী ভট্টাচার্যের ওই ভিডিও প্রচারের পরপর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম পাঁচ বছরের জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়ে একটি ফেসবুক পোস্ট দিয়েছেন। আর এর পরপরই ফেসবুক জুড়ে নানা রকমের ইভেন্ট খোলা হয়েছে। অনেকেই পোস্ট দিয়ে একই রকমের দাবি জানিয়েছেন। সব কথার সার কথা হলো, আগামী পাঁচ বছরের জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ক্ষমতায় দেখতে চাই। সর্বশেষ জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ শেষে ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন মুসল্লিদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিলেন তখনো এই দাবির পুনরাবৃত্তি আমরা তাদের মুখে শুনতে পেলাম। 

কিন্তু কেন হঠাৎ করেই এরকম দাবি জোরেশোরে উঠলো? সর্বশেষ জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন নির্বাচন ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যেই হবে। এর মধ্যে চীন সফর ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটেনি। 

তাহলে কি চীন সফরেই এমন কিছু ঘটেছে যা মানুষকে আরও পাঁচ বছর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ক্ষমতায় দেখতে চাওয়ার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করেছে?

একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, চীন সফর দারুণভাবে সফল হয়েছে। ভেতরে কতটা চুক্তি হলো, কতগুলো সমঝোতা হলো বা কত বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল সেগুলো আসলে একটা দ্বিপাক্ষিক সফরের ইমেজ তৈরি করে না। বরং একটি দেশের সরকার প্রধানকে কীভাবে রিসিভ করা হলো, কীভাবে সংবর্ধনা দেওয়া হলো এবং তার সঙ্গে কী আচরণ করা হলো সেগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের কাছে। সেদিক দিয়ে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর ব্যাপক সফল হয়েছে বলা যায়। কিন্তু এই সাফল্য কি সরকারের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে, তারা এর ওপর ভরসা করে পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় থেকে যেতে পারে?

সাথে সাথে এ কথাও বলে রাখা দরকার যে, এবারের রমজানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বেশ সাফল্য দেখিয়েছে। চাল ও তেল ছাড়া জিনিসপত্রের দাম খুব একটা বাড়েনি। যাত্রায় বাড়তি ভাড়া আদায়, হয়রানি, যানজট, দুর্ঘটনা খুবই নিয়ন্ত্রিত ছিল। অর্থনীতির অবস্থা এখন মোটামুটি স্থিতিশীল, বৈদেশিক রিজার্ভ সন্তোষজনক, আমদানি রপ্তানি স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে। শেখ হাসিনার মেয়াদকালের চেয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। 

কিন্তু এগুলো কি সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে থেকে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট যুক্তি তৈরি করে?

অনেকেই মনে করছেন, সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পিনাকী ভট্টাচার্য যখন একটি প্রস্তাব দিয়েছেন এবং সেই প্রস্তাবের সঙ্গে সারজিস আলম এক ধরনের প্রতিধ্বনি করেছেন, ফলে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারটি জাতীয় সরকারে রূপান্তরিত হতে চায়। জাতীয় সরকারে তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। এবং এর মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের জন্য তারা ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে নিতে চায়। 

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই সম্ভবত পিনাকী ভট্টাচার্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উপপ্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সরকারে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। এই প্রক্রিয়া যদি আগাতে থাকে তবে হয়তো ধীরে ধীরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও নানান রকমের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। 

প্রস্তাবটা নিয়ে সকলেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। দু’একজন বাদ দিয়ে কেউই এ নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে চাইছেন না। এমনকি বিএনপি’র পক্ষ থেকেও কোনো উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি। 

পিনাকী ভট্টাচার্য তার একটি ভিডিওতে একটি উদ্ভট প্রস্তাবনা হাজির করেছেন। তার যুক্তি হলো, ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেহেতু খুব ভালো সরকার চালাচ্ছেন এবং প্রচুর সাফল্য অর্জন করছেন, ফলে তাকে সাত জানুয়ারি নির্বাচন পরবর্তী গঠিত সরকারের পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় রাখা দরকার। আর এজন্য তাকে প্রধান রেখে জাতীয় সরকার তৈরি করা দরকার। যে সরকারে বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদের সফল উপদেষ্টারা থাকবেন, পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে উপদেষ্টা নিয়ে সেই জাতীয় সরকার গঠিত হবে। এই সরকারের উপপ্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তারেক রহমানকে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। 

অর্থাৎ, পিনাকী ভট্টাচার্য শিগগিরই কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পক্ষে নন। তিনি চান গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারটি আরও দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকুক। শুধু পিনাকী ভট্টাচার্য নন, ফরহাদ মজহারসহ আরও কয়েকজন বিশ্লেষক ও বুদ্ধিজীবী নির্বাচনের বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছেন। তারা বলতে চান, সংস্কারের মধ্য দিয়ে একটা গুণগত পরিবর্তনের পর নির্বাচন হওয়া উচিত। কেউ কেউ মনে করেন সরকারের ভেতরেও এই মতের সমর্থন আছে। কিন্তু সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এবং প্রধান উপদেষ্টা নিজে নির্বাচনের ব্যাপারে উৎসাহী। 

আর এটিই সরকারের জামায়াতপন্থী অংশকে খুব একটা সুবিধা দিচ্ছে না। কেননা ছোট দল হয়েও ছাত্রদের সঙ্গে কৌশলগত মৈত্রী তৈরি করে এবং সরকারকে শর্তহীন সমর্থন দিয়ে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় বড় ধরনের ভাগ বসিয়েছে। তারা শিক্ষাঙ্গনগুলোকে নিজেদের কব্জায় নিয়েছে, বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি ও প্রক্টর পদগুলোতে নিজেদের লোক বসিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জামায়াত সমর্থিত ইসলামী ছাত্রশিবির ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। আমলাতন্ত্র, পুলিশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জামায়াত এবং শিবির দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে।

ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন হলে এবং সেই নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের কোন মৈত্রী তৈরি না হলে সঙ্গত কারণেই জামায়াত ক্ষমতার মধুচন্দ্রিমা থেকে ছিটকে পড়বে। এ অবস্থায় জামায়াত চায় না শিগগিরই নির্বাচন হোক। ছাত্রদের জামায়াত প্রভাবিত অংশটিও নির্বাচন চায় না। তাদের সঙ্গে সঙ্গে, পিনাকী ভট্টাচার্যসহ পিনাকী-প্রভাবিত বুদ্ধিজীবীরাও নির্বাচন চান না। এ কারণে তারা নির্বাচনের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রচারণা শুরু করেছেন। 

এটা মূলত জামায়াতে ইসলামেরই প্রচারণা। খুব কৌশলে পিনাকীর মাধ্যমে এই প্রচারণা ছড়িয়ে জনগণকে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, সরকার এর সঙ্গে জড়িত। সরকার চায় দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতে। আবার সরকারকে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, তাদের পক্ষে ব্যাপক জনমত তৈরি হয়েছে। জনগণই চাচ্ছে সরকার যেন দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকে। মূলত জামায়াত প্রভাবিত আইডিগুলো থেকে এই প্রচারণায় বাতাস দেওয়া হচ্ছে। খুব সম্ভবত জাতীয় ঈদগাহে জামায়াত সমর্থকরাই পরিকল্পিতভাবে পাঁচ বছর স্লোগান দিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, চাইলেই কি এই সরকারের পক্ষে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকা সম্ভব? 

এই সরকার বিপুল জনসমর্থন সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছে। কিন্তু, শুরুতেই জামায়াত ও ইসলামপন্থিদের প্রতি সরকারের অতিরিক্ত সখ্যতার কারণে উদারপন্থিরা সরকারের কাছ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। নানা রকমের বিভাজনের কারণে ছাত্রদের জনপ্রিয়তাও দিন দিন কমতে শুরু করেছে। নারীর প্রতি সহিংসতাসহ নানা ঘটনা সমাজে গভীর-ভীতি তৈরি করেছে। সারাদেশে মাজার ভাঙচুর, গানের অনুষ্ঠান বন্ধ করা, শিল্পীদের হুমকি-ধামকিতে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে যাতে মনে হয় দেশে ইসলামপন্থি উগ্রবাদের ব্যাপক উত্থান ঘটেছে। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ এখন মনে করে, ইসলামপন্থি উগ্রবাদের ফলে তারা বেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। 

বিশেষ করে যত্রতত্র মব তৈরি করার মধ্য দিয়ে যেভাবে সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হয়েছে তাতে বহু মানুষ উদ্বিগ্ন। বেশ কিছু উগ্রবাদী মবের সঙ্গে পিনাকী ভট্টাচার্য এবং তার প্রভাব বলয়ের লোকদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, একটি গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে জামায়াত, হেফাজত ও অন্যান্য উগ্রবাদী অংশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সারাদেশে মব তৈরি করছে। সরকার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নীরবতা ও নমনীয়তার পরিচয় দিচ্ছে। 

এরকম একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে নির্বাচনের দাবি জোরেশোরে উঠছে। কেননা, এই পরিস্থিতি যেকোনো সময় বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের বিপদ তৈরি করতে পারে। শক্ত রাজনৈতিক সরকার ছাড়া এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন। 

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থিতিশীল সরকার চায়। সেনাবাহিনীও ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন চায় বলে বারবার জানিয়েছে। ফলে, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে নির্বাচন আয়োজন প্রাধান্য পাওয়া উচিত। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করলে সেই সরকার সব দিক থেকে জাতীয় সরকার হবে বলে বিএনপি বারবার বলে এসেছে। সেই সরকারেও ড. ইউনূসের দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ থাকবে।

ড. ইউনূস সেই সরকারের রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টাও হতে পারেন। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে পরিস্থিতির মধ্যে আছে তাতে এই সরকারের মেয়াদ বৃদ্ধি করার প্রস্তাব খুব বিপৎজনক হবে। 

জাতীয় সরকার হোক বা যেকোনো ফরমেটে এই সরকারের দীর্ঘমেয়াদে থাকা উচিত হবে না। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের যে ভাবমূর্তি বিশ্বব্যাপী তৈরি হয়েছে তাতে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারের প্রধান হিসেবে তিনি মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য। তিনি তার কাজ দিয়ে প্রমাণ করেছেন বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু, জোর-জবরদস্তি করে তাকে ক্ষমতায় রেখে দেওয়ার চেষ্টা হিতে বিপরীত হবে। বরং নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত হলে সেই সরকার যদি তাকে মূল্যায়ন করে, তবে সেটি হবে সবচেয়ে প্রত্যাশিত ব্যাপার।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Logo

প্রধান কার্যালয়: ৬০৯০ ডাউসন বুলেভার্ড, নরক্রস, জর্জিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।

ই-মেইল: banglaoutlook@gmail.com

অনুসরণ করুন