দূর্গাপূজা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এক বড় পরীক্ষা

আহমেদ খিজির
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৪, ১১:৫৫ এএম

বাংলাদেশের সনাতন ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হয়ে গেছে। মহাসমারোহে দেবীর আগমন ঘটেছে নিজ গৃহে, আর ভক্তরা আশায় আছেন সামনের শুভদিনের। দেবীর কৃপায় এই দেশে শান্তি বিরাজ করবে, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে দেশকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, এই প্রার্থনা করবেন ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা। এই দুর্গাপূজা এমন একটা সময়ে আসলো যখন এ দেশের মানুষ এক শক্তিশালী অসুর বধ করে নতুন স্বপ্ন দেখছে। গণতন্ত্রের স্বপ্ন। যেখানে সকল মতের, বিশ্বাসের মানুষ পরস্পরকে সম্মান দিয়ে, শ্রদ্ধা দিয়ে একসাথে বসবাস করবে। দেশকে গড়ে তুলবে।
তবে, অসুরের তাণ্ডবলীলা থেমে গেছে বলা ভুল হবে। এখনও, পতিত শয়তান আর এর দোসররা এ দেশের মানুষকে নানাভাবে লুট করতে চাইবে, অত্যাচারে জর্জরিত করতে চাইবে। এর ষড়যন্ত্র চলছে। পূজার সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, অশান্তি লাগিয়ে দেশকে নরক বানাতে চাইবে।
গত ষোল বছর বাংলাদেশের হিন্দুদের জিম্মি করে রেখেছিলো হাসিনাশাহী। প্রতিবেশী ভাই-বন্ধু মুসলমানদের জংগি হিসেবে দেখিয়ে তাদের মধ্যে অশান্তি, অবিশ্বাস আর ভয়ের বীজ বুনে দিয়েছিলো। আওয়ামী লীগ না থাকলে হিন্দুদের রক্ষা নেই এমনটাই তারা ধারণা দিতো।
অথচ, বছরের পর বছর মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে। বেশির ভাগ সময়েই দেখা গেছে, এগুলো সরকারি দলের সাজানো ভাংচুর। প্রতিবছর তাণ্ডব চললেও প্রশাসন নির্বিকার ছিলো। আর আওয়ামী পালিত সুশীলরা প্রচার করেছে এগুলো উগ্র মুসলমানদের কাজ। অথচ, যখন প্রমাণ হাজির হয়েছে এগুলো সরকারি দলের কাজ তখন তারা উচ্চবাচ্য করেনি।
হাসিনা পালালেও তার দোসররা এখনও ক্ষমতায়। দীর্ঘ ১৬ বছর এন্তার লুটপাট করে তাদের দেশে-বিদেশে প্রচুর অর্থ জমেছে। এইবার পূজায় সেসব ব্যাবহার করে একটা অনর্থ তৈরির চেষ্টা করবে এতে সন্দেহ সামান্যই। আওয়ামী লীগের ইতিহাস তাই বলে। ইতিমধ্যেই কিশোরগঞ্জসহ একাধিক জায়গায় প্রশাসনের লোকরা মণ্ডপ ও প্রতিমা ভাঙচুরে ইন্ধন ও সহযোগিতা করেছে বলে জানা গেছে। এই লোকেরা আওয়ামী আমলে সুবিধাপ্রাপ্ত। তারা সামনে আরো বড়সড় পরিকল্পনা করবে বলেই প্রতীয়মান।
হাসিনার পতনের পর থেকেই ভারতের মিডিয়া অনবরত মিথ্যা তথ্য দিয়ে এ দেশকে হিন্দুবিরোধী দেখানোর চেষ্টা করছে। বোঝাতে চেষ্টা করছে যে, এই দেশের হিন্দুরা বিপন্ন। তারা তিলকে তাল দেখাচ্ছে। তারা ওত পেতে আছে দুর্গাপূজায় কোনোরকম অশান্তি হলে তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেখানোর।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শত চেষ্টার পরেও আওয়ামী অপশক্তি আর ভারতের প্রচারমাধ্যমকে সামলানো কঠিন হবে। অন্যদিকে, এই দেশের কিছু উগ্রপন্থী তথাকথিত ইসলামী চিন্তার নেতারাও হিন্দুবিদ্বেষ উসকে দিতে পারে। ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি, ঢাকার উত্তরা আর বাড্ডায় পূজা করতে না দেওয়া নিয়ে মিছিল। এসব মিছিল বাংলাদেশের সম্প্রীতির জন্য হুমকি। এগুলো আওয়ামী বয়ানের জন্য সহায়ক।
ফলে, কেবল সরকারের উপর নয়, প্রতিটি গণতন্ত্রকামী মানূষের কর্তব্য সম্প্রীতী রক্ষা করা। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া নতুন বাংলাদেশকে সুরক্ষা করা।
ব্যাপারটা দুঃখজনক যে, এ দেশেরই একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষকে তাদের উৎসব পালনের জন্য সুরক্ষা দিতে হবে। বাংলাদেশি হিসেবে প্রতিটি হিন্দুর অধিকার আছে আনন্দ নিয়ে, কোনোরকম দুশ্চিন্তা ছাড়া উৎসব পালন করার। দীর্ঘ স্বৈরাচারী আমল থেকে মুক্ত হবার পর গণতন্ত্র উপভোগ করার। তবে, পুরোপুরি উদ্বেগমুক্ত করতে না পারলেও এই দেশের প্রতিটি গণতন্ত্রী মানুষের দায়িত্ব সহনাগরিকের উৎসবকে সুরক্ষা দেয়া।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এ এক পরীক্ষা।