
বাংলাদেশে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবার বইমেলায়ও নীতিমালাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আনা হয়েছে পরিবর্তন। 'জুলাই গণ অভ্যুত্থান: নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ' এই প্রতিপাদ্যে চলছে একুশে বইমেলা। নানা আলোচনা - সমালোচনার মধ্যে পেরিয়েছে এক সপ্তাহের বেশি।
এবার শুরু থেকেই বাংলা একাডেমির দেওয়া নীতিমালার কিছু বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নীতিমালা অনুযায়ী ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ২০২৪-এর গণ অভ্যুত্থান বিরোধী কোনো বই বা পত্রিকা বিক্রি বা প্রদর্শন করা যাবে না।
এছাড়া প্রদর্শন, বিক্রয় ও প্রচার করা যাবে না কোনো জাতিসত্তা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন বই ও পত্রিকা।
বইমেলার পক্ষে ক্ষতিকর লেখা বই বা পত্রিকাও বিক্রি করা যাবে না। এ নিয়ে লেখক সাহিত্যিকদের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।
তারা বলছেন, এখানে 'বিরোধী' বলতে কী বুঝানো হচ্ছে, তা নীতিমালায় সুস্পষ্ট করা হয়নি।
অন্যদিকে, এবারের বইমেলায় মুক্তিযুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও মনে করছেন তারা।
লেখক আহমাদ মোস্তফা কামাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমার কোন বিষয়ে সমালোচনা থাকতেই পারে। তো সেই সমালোচনাকে যদি বিরোধীতা হিসেবে ধরে নেয়া হয়, সেজন্য যে ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, সেটা অবশ্যই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।"
মেলা শুরুর আগেই পুলিশ কমিশনারসহ দুইজন কর্মকর্তার বইমেলা নিয়ে করা মন্তব্যেরও সমালোচনা করেন লেখকদের অনেকেই।
পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত গত ৩১শে জানুয়ারি নিরাপত্তা সংক্রান্ত এক প্রেসব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, বাংলা একাডেমি পাণ্ডুলিপি পড়ে দেখতে পারে, স্ক্যানিং করতে পারে। যা আগামী বছর থেকে হতে পারে।
যদিও সমালোচনার মুখে পরে এক বিবৃতিতে পুলিশ প্রশাসন এ ধরনের বক্তব্য দওয়ার বিষয়টিই অস্বীকার করেছিল।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ কিভাবে তদারকি নিশ্চিত করবে বা করছে? কারা করছে এই তদারকি?
নীতিমালা না মানলে শাস্তি
এ বছর একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণের শর্ত হিসেবে নীতিমালায় যা বলা হয়েছে, মেলায় অংশ নেওয়া কোনো প্রতিষ্ঠান ও প্রকাশক সেগুলো মানতে ব্যর্থ হলে তাদের স্টল বরাদ্দ বাতিল করা হবে।
স্টল বাবদ জমা দেয়া টাকা ফেরত দেয়া হবে না।
এমনকি ভবিষ্যতে তিনি মেলায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন কিনা সে বিষয়ে পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
এছাড়া এ সমস্ত অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত হলে পরবর্তী তিন বছরের জন্য ওই প্রতিষ্ঠান বা প্রকাশনা সংস্থা বইমেলায় অংশগ্রহণের অযোগ্য বিবেচিত হবে।
লেখকরা কী বলছেন ?
লেখক সাহিত্যিকরা 'রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, ২০২৪ এর গণ অভ্যুত্থান-বিরোধী, যে কোন জাতিসত্তা বিরোধী' এই বিরোধী শব্দের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
কারণ 'বিরোধী' বলতে কী বোঝায় নীতিমালার কোথাও সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয় নি বাংলাএকাডমি।
নীতিমালায় এ ব্যাপারে ধোঁয়াশা রাখা হয়েছে বলে মনে করেন লেখক আহমাদ মোস্তফা কামাল।
মি. কামাল বলেন, "এখানে বিরোধী বলতে কী বোঝায় ? সমালোচনাকে বিরোধীতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হবে কি না? এটার মানদণ্ড কী? এ বিষয়ে পরিষ্কার করে কিছু বলা হয় নি"।
তিনি বলেন, "একজন লেখক কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবেন সেটির যদি সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়, তাহলে তার স্বাধীনতা থাকে না " বলে মনে করেন এই লেখক।
সমাজে অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা সহিংসতা তৈরি করতে পারে, এমন কাজগুলোকে বাংলা একাডেমি বিরত থাকতে বলতে পারে, এটা তাদের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন মি. কামাল।
তবে মি. কামাল বলেন, " ডিএমপি কমিশনার বললেন আগামী বছর বইমেলার আগে লেখকদেরকে বাংলা একাডেমীতে পাণ্ডুলিপি জমা দিতে হবে এবং সেগুলো তারা পড়ে দেখবেন। এগুলো একেবারেই অবান্তর।"
লেখকদের উপরে কোন রকমের কিছু চাপিয়ে দেয়া, কোন প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা দেয়ার বিরোধিতা করেন এই লেখক।
দাঙ্গা ফ্যাসাদ তৈরি করা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, জাতিগত নিপীড়ন উস্কে দেয়া, এমন কোন কিছু না লেখার এইটুকু দায়িত্বশীলতা লেখকদের রয়েছে বলে মনে করেন আহমাদ মোস্তফা কামাল।
আরেকজন লেখক এ বছর বই মেলার আয়োজনে বাংলা একাডেমী মুক্তিযুদ্ধের কথা উল্লেখ না করে ভাষা আন্দোলন থেকে সরাসরি ২৪ এর জুলাই গণ অভ্যুত্থানে চলে যাওয়ার বিরোধিতা করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকএই লেখক অবশ্য বলেন, বইমেলার উদ্বোধনের সময় মুক্তিযুদ্ধের কথা আসেনি এজন্য তিনি বিরক্ত হয়েছেন।
তিনি বলেন, "শুধু বায়ান্ন আর চব্বিশ। মাঝখানে মুক্তিযুদ্ধকে উইথ-ড্র (এড়িয়ে যাওয়া) করে দেয়া হয়েছে। কেন এটা আসবে না, আমি ওইটার বিরোধী"।
এই লেখক এবার লেখকদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার বিষয়েও উদাহরণ দেন।
তিনি বলেন, "বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখালেখি করেছেন। যার কারণে পরিবারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার কারণে ওই লেখককে এ বছর মেলায় যেতে নিষেধ করা হচ্ছে। এবার তার প্রথম উপন্যাস বের হয়েছে কিন্তু মেলার এক সপ্তাহ পেরোলেও এখনো যান নি"।
যা বলছে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ
এদিকে, বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ বলছে, কোন বইয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেটিই অনুসরণ করা হয়।
বাংলা একাডেমির একজন পরিচালক সরকার আমিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "কোন বই নিষিদ্ধ করার এই পুরো কাজটা কিন্তু রাষ্ট্র কর্তৃক হবে।"
বাংলা একাডেমী রাষ্ট্রীয় বিধানের আলোকে বই মেলা করছে বলে মন্তব্য করেন মি. আমিন।
নীতিমালায় এই 'বিরোধী' বলতে কী বোঝানো হয়েছে এমন প্রশ্নে মি. আমিন বলেন, " এই জায়গায় ব্যাখ্যাটা হচ্ছে আসলে আমরা সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করবো।কারণ বাংলা একাডেমি কোন পুলিশী প্রতিষ্ঠান নয়।"
"এটা গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান। আমাদের কাজ আইন তৈরি করা না। আমরা রাষ্ট্রের আইন, নির্দেশনা ফলো করি। রাষ্ট্রের আইনের আলোকেই ওই ধারাটা রেখেছি যদি তেমনটি ঘটে তাহলে আমরা এই জিনিসগুলো বিবেচনা করবো" বলেন মি. আমিন।
তদারকি করবে কে ?
বইমেলায় নীতিমালা বিরোধী কোন কাজ হচ্ছে কিনা- তা তদারকি করতে একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা এই টাস্কফোর্সে রয়েছেন।
মি. আমিন জানান, " টাস্কফোর্সের কমিটি মেলায় নীতি-বিরোধী কোন কাজ হচ্ছে কী না, সে বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন করে। বইমেলার সময়ই এই টাস্কফোর্স কাজ করে। শুধু তাই নয়, যে প্রতিষ্ঠানগুলো বইমেলায় স্টল বানিয়েছে, তারা কোন অনিয়ম করলে সেটাও টাস্কফোর্স বিবেচনায় নিচ্ছে"।
বাংলা একাডেমির সচিব সেলিম রেজার নেতৃত্বে এই টাস্কফোর্সের সদস্য রয়েছেন বার জন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের প্রতিনিধি, জাতীয় গ্রন্থ-কেন্দ্রের একজন প্রতিনিধি এই কমিটিতে রয়েছেন।
এছাড়াও একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, তিন জন প্রকাশক, বাংলা একাডেমির আরও দুই জন কর্মকর্তা এই টাস্কফোর্সে রয়েছেন।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও এই কমিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন।
কিভাবে এই টাস্কফোর্স তদারকি নিশ্চিত করবে, এমন প্রশ্নে বাংলা একাডেমীর পরিচালক সরকার আমিন বলেন, " রাষ্ট্রীয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোন কিছু আছে কী না- এই পুরো বিষয়টি টাস্কফোর্স বিবেচনায় নিবে।"
মি. আমিন জানান, "কোন প্রতিষ্ঠানকে বইমেলায় সতর্ক করা, পরবর্তী বছর যাতে অংশগ্রহণ না করতে পারে, সে বিষয়ে সুপারিশ করতে পারবে এই টাস্কফোর্স"।
তবে শুধু স্টল বাতিল করার এখতিয়ার বাংলা একাডেমির থাকলেও এর চেয়ে বেশি শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা নেই বলে জানিয়েছেন এই পরিচালক।
এদিকে, লেখক আহমাদ মোস্তফা কামাল বাংলা একাডেমির পক্ষে এতো বিপুল সংখ্যক বই তদারকি করা সম্ভব কী না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, গত কয়েক বছরে বইমেলার পরিসংখ্যান বলছে চার থেকে পাঁচ হাজার বই প্রকাশিত হয় মেলায়।
"ফলে এক মাসে এতো বিপুল সংখ্যক বইয়ের পাণ্ডুলিপি পড়ে দেখা বাংলাদেশের কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব কী না এবং একজন লেখক কেন বাংলা একাডেমিতে তার পাণ্ডুলিপি জমা দেবেন" সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন এই লেখক।