কুড়িগ্রামে সাংবাদিককে তুলে নিয়ে নির্যাতন
ডিসি সুলতানা, ৩ ম্যাজিস্ট্রেটের অপরাধ ‘প্রমাণিত’ হলেও ঝুলে আছে মামলার প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৫, ১২:২২ এএম

আরিফুল ইসলাম রিগান ও সুলতানা পারভীন
কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানকে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে ক্রসফায়ারে দিয়ে হত্যাচেষ্টা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে নির্যাতনের ঘটনার পাঁচ বছর হলো আজ। এ ঘটনায় কুড়িগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন এবং আরডিসি নাজিম উদ্দিনসহ তিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের করা বিভাগীয় মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু আরিফ বাদী হয়ে করা ফৌজদারি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ঝুলে আছে। পাঁচ বছর হয়ে গেলেও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
এ বিষয়ে পিবিআইয়ের ভাষ্য, তারা তদন্তকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। শিগগির আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
আরিফুল ইসলাম রিগান অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি। ২০২০ সালের ১৩ মার্চ মধ্যরাতে (১৪ মার্চ) তাকে বাসা থেকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে ক্রসফায়ারের হুমকিসহ ডিসি অফিসে নিয়ে নির্যাতন করেন জেলা প্রশাসনের তৎকালীন আরডিসি নাজিম উদ্দিন, এনডিসি রাহাতুল ইসলাম ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা। এরপর অধূমপায়ী আরিফকে আধাবোতল মদ ও দেড়শ গ্রাম গাঁজা পাওয়ার অভিযোগ এনে ওই রাতেই এক বছরের কারাদন্ড দিয়ে জেলে পাঠানো হয়। পুরো ঘটনার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন। ডিসি সুলতানাকে নিয়ে ‘ কাবিখার টাকায় পুকুর সংস্কার করে ডিসির নামে নামকরণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জেরে সাংবাদিক আরিফকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন ও জেল দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠলে ১৫ মার্চ আরিফকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। ঘটনার পর তদানীন্তন ডিসি সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দীন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসএম রাহাতুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। একইসঙ্গে এ ঘটনায় বিভাগীয় মামলা দায়ের হয় এবং ঘটনাটি তদন্তে কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে ডিসি সুলতানাসহ সকলের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়। অভিযুক্ত প্রত্যেককে বিভাগীয় শাস্তি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়।
শাস্তি হিসেবে ডিসি সুলতানার ইনক্রিমেন্ট দুই বছরের জন্য স্থগিত করে মন্ত্রণালয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহাতুল ইসলামের ইনক্রিমেন্ট তিন বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। আরডিসি নাজিম উদ্দিনকে পদাবনতি দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আর ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমাকে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রত্যেকে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ক্ষমা মঞ্জুর হলে পদায়ন ও পদোন্নতি পান অভিযুক্ত কর্মকর্তারা। যদিও অন্তবর্তী সরকার ২০১৮ সালের নির্বাচনের দায়িত্বপালনকারী সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীন (বর্তমানে যুগ্ম সচিব) কে ওএসডি করেছে।
এদিকে একই ঘটনায় সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের দায়ের করা মামলাটি নিম্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। একের পর এক তারিখ পেছালেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি তদন্ত সংস্থা পিবিআই।
সাংবাদিক আরিফ বলেন, ‘সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মচারী হওয়ায় আসামিরা এখনও গ্রেফতার হয়নি। তারা বহাল তবিয়তে চাকরিতে বহাল রয়েছেন। আইন ও আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুুলি দেখিয়ে চলছেন। চাকরিতে বহাল থাকায় তারা মামলার তদন্তকাজে প্রতিবদ্ধকতা তৈরি করছেন। বিভাগীয় মামলায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে। বিভাগীয় শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তারা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা নিয়ে শাস্তি মওকুফ করেছেন। এখন তারা ফৌজদারি মামলার কার্যক্রমে বাঁধা সৃষ্টি করছেন।’
তিনি বলেন, ‘মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য আমি পিবিআইয়ের তদন্তে আস্থা রেখেছিলাম। কিন্তু আসামিপক্ষ সেখানেও প্রভাববিস্তার করছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছি সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তদন্ত সংস্থাকে প্রভাবিত করা হচ্ছে। ফলে পাঁচ বছরেও পিবিআই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে না। এটা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চরম অবহেলা। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও বিচার পাওয়া নিয়ে উদ্বেগের বিষয়।’ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ‘ এ ধরণের প্রমাণিত অপরাধে পাঁচ বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। এটি শুধু তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা নয় বরং বিভাগীয় মামলায় প্রমাণিত আসামিদের যোগসাজসে বহাল তবিয়তে চাকরি করার সুযোগ দেওয়ার সামিল।’
আসামিদের নিজ বিভাগীয় তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ফৌজদারি মামলা পরিচালনায় অভিজ্ঞ এই আইনজীবী বলেন, ‘ পুলিশ রেগুলেশনস ১৯৪৩ এর ২৬১ (গ) প্রবিধান অনুসারে যত কঠিন মামলাই হোক না কেন ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব। এই আইন বিদ্যমান থাকার পরও তদন্তকারী ব্যক্তি পাঁচ বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেননি। এটা শুধু দায়িত্বে অবহেলা নয়, অপরাধও বটে। কেননা ১৯৪৩ এর কোনও প্রবিধান লঙ্ঘিত হলে ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের ২৯ ধারা অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন পাঁচ বছরেও দাখিল না করা উক্ত আইনের লঙ্ঘন ও অপরাধ।’
জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআই ইন্সপেক্টর রায়হান বলেন, ‘ আগের তদন্ত কর্মকর্তা মিশনে দেশের বাইরে আছেন। আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। এ নিয়ে পরে কথা বলবো।’
রংপুর পিবিআই পুলিশ সুপার জাকির হোসেন বলেন, ‘ ওই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত ও আদালতে দাখিল করার বিষয়ে এই মাসে একটি মিটিং আছে। তদন্ত কর্মকর্তাকে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’