Logo
Logo
×

বিশ্লেষণ

বসুন্ধরা কি দেশের ফুটবলটাও ধ্বংস করবে?

Icon

সুবাইল বিন আলম

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ০১:৩০ পিএম

বসুন্ধরা কি দেশের ফুটবলটাও ধ্বংস করবে?

বিগত সরকারের আমলে সব থেকে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ছিলো বসুন্ধরা গ্রুপ। জমি দখল থেকে বিভিন্ন ব্যবসাতে অন্যায় সুবিধা শুধু না, মানুষ খুন করেও পার পেয়ে গেছে তারা। এই দেশে অলিগারকদের লিস্টে তারা সব সময়েই প্রথমে ছিলো। তাদের এই মাফিয়াতন্ত্রের জন্য তাদের সমগোত্রীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলা ব্যবসাই করতে পারতো না বলে কথিত আছে। এমনকি জুলাই মাসে বসুন্ধরার মালিকের শেখ হাসিনার পাশে সারাজীবন থাকার কথাও মানুষ এখনো ভুলে নাই। 

এই বসুন্ধরা যখন ফুটবলের একটা ক্লাব নিয়ে আসলো বসুন্ধরা কিংস নামের, তখন অনেকে ভ্রু কুচকেছিলো। বিশাল বাজেট নিয়ে তারা দেশের প্রথম সারির সব ফুটবলারকে কিনে নিয়ে শুরু করে। নিয়ে আসে বাংলাদেশ মানের থেকে ভালো বিদেশী। কিন্তু যার হচ্ছে বাকা পথে সব পাওয়ার অভ্যাস, তাদের কি সহজ পথ ভালো লাগে? যারা নিয়মিত খেলা দেখে তাদের ভাষ্যমতে, আবাহনীর পাতানো খেলা এবং রেফারী ম্যানেজের বাটনটা, তারা তাদের কন্ট্রোলে নিয়ে নেয়। টাকার লোভে জাতীয় দলের অনেক খেলোয়াড় ওদের বেঞ্চে বসে ক্যারিয়ার নষ্ট করলো। তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের সাহায্যপুষ্ট আবাহনী, রাসেল বা জামালও দামের প্রতিযোগীতাতে ঝাপিয়ে পড়ে। মোহামেডানের মত ক্লাবও তখন কোনো জাতীয় দলের খেলোয়াড় না নিতে পেরে তরুণদের নিয়ে দল বানায়। কিন্তু যাই করুক, প্রতাপশালী বসুন্ধরা কিংসের জন্য আবাহনী, শেখ রাসেল বা শেখ জামালও আর লিগের ধারেকাছে যেতে পারে নাই। 

এরপর আসে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কথা। লীগ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তারা এ এফসির টুর্নামেন্টগুলাতে যেতো। দারুণ টিম হওয়া সত্ত্বে ও লীগে পাতানো খেলা এবং রেফারি ম্যানেজের ফল তারা হাতেনাতে পায় এই টুর্নামেন্টগুলাতে। নিজেদের কম্পিটেন্স হারিয়ে ফেলাতে তারা বড় আসরে আর ফাইট দিতে পারে না। ওদের একমাত্র ভরসা থাকে বিদেশিরা। ওরা না পারলে আর কিছু করার নাই। এছাড়া ফাউলের ছড়াছড়ি তো আছেই। ঘরোয়া ফুটবলে পার পেয়ে গেলেও বাইরে তো আর কার্ড থেকে পার পাওয়া যাবে না। এভাবেই তারা আমাদের আন্তর্জাতিক আশাগুলাকে শেষ করেছে। 

এই ক্লাবের পারফরমেন্সেই বসুন্ধরা কিংসের ইমরুল হাসান তৎকালীন সভাপতি কাজী সালাউদ্দীনের খুব কাছের হয়ে যায়। কিন্তু কাজী সালাউদ্দীন বাফুফে থেকে চলে গেলেও উনি বাফুফেতে এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। পট পরিবর্তনে আসলে কিছু যায়-আসে নাই। 

বসুন্ধরা কিংসের একমাত্র অবদান ঢাকাতে একটা ফুটবল মাঠ দেয়া। যা এখন জাতীয় দলও ব্যবহার করে। কিন্তু কিংসে বসে বসে জাতীয় দলের অনেক খেলোয়াড়েরই ম্যাচ প্র্যাকটিসের ঘাটতি,  ফাউলের প্রবণতা, কম্পিটেন্সের অভাব বিদেশেও সফল হতে দেয় নাই আমদের ফুটবলকে। কিন্তু দেশের ফুটবল এখন তাদের সেরা জেনারেশন নিয়ে চলছে। এই সময়েই একটা অঘোষিত নিয়ম হয়ে গেলো, বসুন্ধরা কিংসের খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে সুযোগ বেশি দিতে হবে। 

এই অঘোষিত নিয়ম থেকে ফুটবল পরিমন্ডলে একটা নতুন নাম আসলো ‘সিন্ডিকেট’। এই সিন্ডিকেট আগে কন্ট্রোল করতো আবাহনী। সেই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আসে কিংস এই সিন্ডিকেট ঠিক করে দেয় কারা জাতীয় দলে খেলবে, খেলবে না। প্রবাস থেকে ভালো খেলোয়াড় আসলেও তাদের লীগে প্রমান দিয়ে ঢুকতে হয়। তাও যদি সিন্ডিকেট সাপোর্ট করে। 

বাংলাদেশের কোচ হিসেবে ক্যাব্রেরা আসার পর এই দলের খেলার মান আগের থেকে বেশ ভালো হয়েছে। কিন্তু উনিও বের হতে পারেন নাই এই সিণ্ডিকেট থেকে। ফুটবলে কোচই সর্বেসর্বা। কিন্তু তার টিম সিলেকশনে দৃষ্টি কটু ভাবে বসুন্ধরা কিংসের খেলোয়াড়দের প্রাধান্য। আর সেরকমই নতুন প্রবাসী ফুটবলার নিতে আপত্তি।

আসুন দেখি গত ভারত ম্যাচের কি হলো। ভারতের সাথে আমরা রিসেন্ট টাইমে খুব ভালো খেলছি। গত ৫ খেলার ৪ টাতেই ড্র। কিন্তু সব গুলাতেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে আমাদের জেতা উচিত ছিলো। এবারো সেরকম সুযোগ হয়েছিলো। আমাদের সাথে ছিলো হামজার মতো একজন খেলোয়াড় যে সাফ, আসিয়ান বা মিডল ইস্টের যে কোন দলে খেলতে পারার মতো যোগ্য। সেই সুযোগ ও আমরা হেলায় হারালাম টিম সিলেকশনের জন্য। 

আমাদের গোল খরা কাটানোর জন্য একটা ভালো খেলোয়াড় পেয়ে যাই – ফাহমিদুল, ইতালী থেকে খেলতে আসে। প্র্যাকটিস ম্যাচে তিন গোল ও করে। কিন্তু বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশ তার সতীরথরা তাকে পাস না দিয়ে বরং বুলিং করতে থাকে। সে মেজাজ হারায় এবং কথা কাটা কাটি হয় গোল রক্ষক শ্রাবনের সাথে, যিনি আবার  বসুন্ধরা কিংসের ও গোলকীপার। সেই সুত্র ধরে কোচ তাকে বাদ দিয়ে দেয়। 

ফুটবল অংগন খেপে যায়। বাফুফে সভাপতি বসে ও এই জিনিস নিয়ে কথা বলতে। কিন্তু দিন শেষে উনি কোচের উপরই আস্থা রাখেন। মুল ম্যাচে দল নির্বাচনে চমক। ক্যাপ্টেন জামাল টিমে নাই!! তার আগে আর এক প্রবাসী কাজেমকেও ইঞ্জুরীর কথা বলে স্কোয়াডে রাখা হয় নাই। বসুন্ধরা কিংসে প্লেয়িং টাইম না পাওয়া মোরসালিনকে টিমে রাখা হয়েছে। যদিও তার প্রতিভা নিয়ে সংশয় নাই। কিন্তু ম্যাচে তাকে একবার ছাড়া আর খুজে পাওয়া যায় নাই। পরে আর ও চমক আসে প্লেয়ার সাবস্টিউশনে। বসুন্ধরার দুই সোহেলকে নামায়। যেখানে বড় সোহেল অনেক সুযোগ পেয়েও জাতীয় দলে ‘লর্ড’ হিসেবে পরিচিত। আর ছোট সোহেলের কিছুটা অফ ফর্ম যাচ্ছে। তারপর আরেক চমক বসুন্ধরার চন্দন যার পুরা লীগেই প্লে টাইম মাত্র ১০১ মিনিট। যেখানে দলে আল আমিনের মতো ইন ফর্ম স্ট্রাইকার এবং ইব্রাহিমের মতো পরিক্ষীত উইংগার আছে। শুধু মাত্র শ্রাবন বাদের বসুন্ধরার সব খেলোয়াড়দের খেলানোর যেন একটা চাপ ছিলো কোচের উপর।  হামজাকে কোচ ডিফেন্সিভ মিডে খেলানোতে উপরে খুব বেশি তার কাজ দেখা যায় নাই। কিন্তু এর মধ্যে ও একটা ফাকা পজিশন ক্রিয়েট করে চন্দনকে ইশারায় একটা পাস দিতে বলতে দেখা যায় ভিডিও তে। চন্দন দেখে শুনে ব্যাক পাস করে সুযোগটা নষ্ট করে। এরকম পাস না দেয়া শুধু জাতীয় দলে না, জুনিয়র লেভেলের ফুটবলে ও দেখা যায়। আর এর জন্যই আংগুল উঠে সিন্ডিকেটের দিকে। আর যেখানে বসুন্ধরার মতো কোম্পানি থাকে সেখানে আসলে কিছুই অবিশ্বাস করা যায় না। 

ফলাফল কোচের উপর আস্থা এতই তলানীতে গেছে প্রবাসী ফুটবলারদের যে জুনে ট্রায়াল হবে সেখানে জাতীয় দলের কোচের কাছে হবে না, ওরা করবে মহিলা দলের কোচ পিটার বাটলারের কাছে। এই আস্থাহীন কোচ কিভাবে প্রবাসীদের সামলাবেন বা তাদের আকর্ষণ করে নিয়ে আসবে?

এই অবস্থায় আসলে বাফুফের সভাপতির চেষ্টা ছাড়া উত্তরনের উপায় নাই। উনি নিজে ও ঘরোয়া লীগে ক্লাব এবং নিজের টাকা দিয়ে জাতীয় দলের কোচ চালিয়ে এসেছিলেন। এই সব সমস্যা তাই উনার অজানা থাকার কথা না। এখন দেখার বিষয় উনি কি শক্ত হাতে সামাল দিবেন, নাকি যেভাবে চলছে সেভাবেই চালাবেন? তাহলে কিন্তু সালাউদ্দীন সাহেবের থেকে উনি খুব বেশি সফল হতে পারবে বলে আশা করা যাবে না। 

 সুবাইল বিন আলম, কলামিস্ট।

Logo

প্রধান কার্যালয়: ৬০৯০ ডাউসন বুলেভার্ড, নরক্রস, জর্জিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।

ই-মেইল: banglaoutlook@gmail.com

অনুসরণ করুন