নিউইয়র্ক টাইমস প্যারানোইয়া ও বাংলাদেশ

সম্প্রতি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে যার সারবস্তু হচ্ছে 'নতুন বাংলাদেশ গঠনের সুযোগ নিচ্ছে ইসলামি কট্টরপন্থীরা'। শিরোনাম দেখেই যে কারও পক্ষে বিষয়টি বোঝা সহজ হবে যে চিহ্নিত কিছু সংবাদ চেরি পিকিংএর মাধ্যমে এই প্রতিবেদনটি করা হয়েছে। তবে জাতি হিসেবে এই প্রতিবেদন নিঃসন্দেহে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। ওদিকে এই প্রতিবেদনকে ইতোমধ্যেই 'মিসিলিডিং' বলে মন্তব্য করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
সম্প্রতি প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস চরমপন্থী শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেননি’। মূল বাস্তবতা হচ্ছে দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদের ছায়ায় থাকা বাংলাদেশ হঠাৎ করে সকল মত ও পথের মানুষের কথা বলার সুযোগ দিয়েছে। এই সুযোগে কিছু উগ্রপন্থী তাদের অবস্থান জানান দিতে চেষ্টা করেছে। তাদের আপাত দৃষ্টিতে কঠোরভাবে দমন করা হলেও থেকে যাওয়া ছবি আর অনেকটা শুটিং স্টাইলে নেওয়া ভিডিও ক্লিপসগুলো যখন চেরি পিকিং করে একটি সংবাদ প্রতিবেদন ছাপানো হয় সেখানে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
সংবাদ উপস্থাপন ও মন্তব্যের ক্ষেত্রে এই চেরি পিকিং তথা পক্ষপাতদুষ্ট বাছাই একটি ভয়াবহ প্রবণতা। বাস্তবে যখন বিভিন্ন রকম সাক্ষ্যপ্রমাণ, তথ্য, উপাত্ত কিংবা সম্ভাবনা থেকে যা কিংবা যেগুলো শুধু নিজের অনুকূলে তথা পক্ষে যায় তা বাছাই বা নির্বাচন করে ভ্রান্ত যুক্তি দেওয়া হয় সেটাকে যুক্তিবিদ্যায় পক্ষপাতদুষ্ট বাছাই বলে। এটাকে ইংরেজি ভাষায় বলা হয় চেরি পিকিং (Cherry picking) বলা হয়। সেজন্যই টাইমসে ছাপা এই প্রতিবেদনটি আপাতদৃষ্টিতে বিভ্রান্তিকর ও বাস্তবতার নিরীখে দেখলে একপাক্ষিক।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতাকে এখানে যতটা সরলভাবে দেখা হয়েছে বাস্তবতা তার থেকে যোজন যোজন দূরের কথা। বিশেষত, একটা আপাত বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছে। প্রায় মাসখানেক এখানে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিল পুলিশ প্রশাসন। তারপরেও এখানে ঘটে যাওয়া সহিংসার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। এমনকি বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতা হিসেবে তারেক রহমান কিংবা বেগম খালেদা জিয়া তাঁদের অনুসারীদের বারংবার সহিংসতা পরিহার করে দেশে শান্তি বজায় রাখতে অনুরোধ করেছেন। নিপীড়িত বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির মতো জামায়াতের নেতারাও তাদের কর্মীদের অনুরোধ করেছেন শান্ত থাকতে।
ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের উপর কতটা নিপীড়নের স্টিম রোলার বিগত বছরগুলোতে চালানো হয়েছে সেটা কমবেশি সবার জানা। আপনাদের শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গিয়েছে জাতীয়তাবাদী দলের নেতা ইলিয়াস আলীকে গুম করে দেওয়া ঘটনা। বিএনপির মতো সমমনা বিরোধী দলগুলোর এমন আরও অনেক নেতাকর্মী কোথায় হারিয়ে গিয়েছেন কেউ জানে না। তাদের হাজারো নেতাকর্মী গ্রেফতার এড়াতে ধানক্ষেতে গিয়ে মশারী টাঙ্গিয়ে ঘুমিয়েছেন এমন সংবাদও প্রচার হতে দেখা গিয়েছিল। সেই প্রতাপশালী ফ্যাসিবাদ যখন বিদায় নিয়েছে, তারপর তারা তাদের উপর সেভাবে প্রতিশোধ নেয়নি, তাদের নেতাদের প্রতি চূড়ান্ত সম্মান প্রদর্শন করে শান্ত থেকেছে—এই বক্তব্য পুরোপুরি অনুপস্থিত থেকে যাচ্ছে সবখানে।
তাই নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বাছাইকৃত যে ঘটনাগুলো তুলে ধরে ভ্রান্ত ধারণা ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে সেগুলোর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া উচিত। বিশেষত, নারীদের বিষয়ে যা লেখা হয়েছে তা হাস্যকর। কারণ বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে নারীর উপযুক্ত অংশগ্রহণ রয়েছে। সম্প্রতি শেষ হওয়া ‘যুব উৎসব ২০২৫’এ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ২৭ লাখ মেয়ে ৩ হাজার খেলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এখানে বিভিন্ন অঞ্চল, প্রান্তিক সম্প্রদায় এবং আদিবাসী যুব সমাজেরও ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। আর সেদিক থেকে চিন্তা করতে গেলে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত ও গতিশীল অংশগ্রহণের চিত্র সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান।
ফ্যাসিবাদ পতনের পর ৭ নভেম্বর এবং ৫ আগস্টের পরাজিত শক্তি নতুন করে নানারূপে ধেয়ে এসেছিল দেশকে অস্থিতিশীল করতে। ফ্যাসিবাদের সময় নিয়োগকৃত দলীয় ক্যাডারদের সরাসরি ভূমিকায় পুলিশ বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে তারা সক্রিয় হয়েছিল ধর্মীয় উগ্রবাদীর লেবাছে। তাদেরই কেউ একটি ফুটবল খেলায় বিরোধিতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে হেয় করেছে। এর বাইরে অভিন্ন ইভেন্ট হয়েছে হাজারের উপরে যা বাংলাদেশিরা খুশিমনে উদযাপন করেছিল। কিন্তু সেই খেলার সংবাদগুলোকে এড়িয়ে মাত্র একটি সংবাদ হাইলাইটস করা নিঃসন্দেহে বিপদজনক এবং পক্ষপাতদুষ্ট বাছাইয়ের চূড়ান্ত রূপ।
ফ্যাসিবাদ পতনের পর গুম খুনের শিকার হওয়া পরিবার, পুলিশের সরাসরি গুলিতে শহীদ হওয়া কিংবা অঙ্গহানিরে শিকার হওয়া ব্যক্তিদের আপনজন, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা প্রাণ সংশয়ে পড়া মানুষগুলোর অনেকে নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি। তারা আইনের প্রতি আস্থা হারিয়ে সরাসরি প্রতিশোধ নিতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। এমনি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হট্টগোল আর বিপরীতে ধর্মীয় সহিংসতাকে আলাদাভাবে চেনাটা কঠিন। আর সেদিক থেকে চিন্তা করলে প্রতিশোধমূলক কিছু আক্রমণকে ধর্মীয় সহিংসতা বলে ভুল ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে।
ফ্যাসিবাদ পতনের পর একটি রাজনৈতিক দল প্রথমে ডাকাতি শুরু করে। সামাজিকভাবে সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে পড়লে তারা আনসার হয়ে ফিরে আসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। তারপর সংখ্যালঘুর বেশ ধরে দেশের নানা স্থানে সহিংসতা ছড়াতে চেষ্টা করে তারাই। ব্যাটারিচালিত রিকশাওয়ালাদের বেশ ধরেও নানা স্থানে আন্দোলন ও সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। আর সেই সময়ের ফুটেজ নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘটিত সাধারণ সংঘর্ষকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে এই প্রতিবেদনে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রকৃতি বিচারে পুরোপুরি রাজনৈতিক এই সহিংসাকে ধর্মীয়ভাবে উপস্থাপনের বাইরে কিছু বাস্তব সত্য রয়েছে। আর তার মূল কারণ রাজনৈতিক দলগুলো ভোটব্যাংক বিবেচনা করে সাম্প্রদায়িক সমর্থন লাভের আশায় ধর্মকে ব্যবহার করে থাকে। এর মাধ্যমে পুরো বিষয়টি চরমভাবে জটিল আকার ধারণ করে। এতে করেই রাজনৈতিক অস্থিরতার সাথে ধর্মীয় নিপীড়নের সংবাদের ফুটেজ ও ছবির মিশ্রণের ঝুঁকি তৈরি হয়। আর সেই সুযোগে ফ্যাসিবাদী শক্তি তাদের লুটের টাকা উপযুক্ত স্থানে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে পুরো পরিস্থিতিকে সাম্প্রদায়িক সংঘাত হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা নিতে পারে। বাস্তবে এটা পুরোপুরি হাস্যস্পদ এবং বিভ্রান্তিকর।
বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা গিয়েছে, গত সাত মাসে রপ্তানি প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সব ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার পরেও ব্যাংকিং খাত গতিশীল রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ১২৩ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে যা ফ্যাসিবাদ পতনের আগে পেন্ডুলামের মতো দুলছিল। নানা সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও একজন ৮৪ বছর বয়সী মানুষ হিসেবে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত আট মাস ধরে নানা অবিশ্বাস্য কাজ সম্পন্ন করেছেন। তিনি এর মাধ্যমে দেশের উত্তাল পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি দেশের যে ক্রান্তিকালে হাল ধরেছেন তার জন্য সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
৮৪ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ এখন বাংলাদেশের জন্য একটি উন্নততর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য বিশ্বজুড়ে সফর করে বেড়াচ্ছেন। তিনি দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন ফ্যাসিবাদ পতনের পর থেকে। সম্প্রতি চীন সফরের সময় চীন সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশকে দুই দশমিক এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ, বিনিয়োগ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানা গিয়েছে ‘ঢাকা আগামী সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের সম্মেলন আয়োজন করবে, যেখানে ৫০টি দেশের দুই হাজার ৩০০ জনেরও বেশি অংশগ্রহণকারী অংশগ্রহণ করবেন, যার মধ্যে মেটা, উবার ও স্যামসাংয়ের মতো বৈশ্বিক কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারাও থাকবেন। পাশাপাশি বিশ্ব ক্রমবর্ধমানভাবে বাংলাদেশকে একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এটি হচ্ছে আশা, শক্তি ও অভূতপূর্ব সুযোগের গল্প—যা সম্মান ও যথাযথ বিবেচনার দাবি রাখে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এই অতি সরলীকরণ এড়িয়ে বাস্তবতার নিরীখে চিন্তা করতে গেলে ধর্মীয় উগ্রবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়। বিশ্বব্যাপী এটি ভয়াবহ একটি সমস্যা যা বিশ্বের নানা দেশ বিভিন্ন রূপে মোকাবিলা করে।
ফ্যাসিবাদ পতনের পর আইনের যথাযথ প্রয়োগ, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কার এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী নানা উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভয়াবহ এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার চেষ্টা চালাচ্ছে। আদিবাসী সম্প্রদায়ের পাশাপাশি হিন্দু, খ্রিস্টান বা অন্য যেকোনো সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় জনসংস্কৃতিকে রক্ষা করার জন্যও উপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতার বদল সম্ভব হলে পুরো পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
বাংলাদেশের নানা স্থানের বিভিন্ন সমাবেশে বিভিন্ন অর্বাচিনের বক্তব্যের খণ্ডিত অংশের বহুল প্রচারের পাশাপাশি ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণা ছড়ানোর প্রচেষ্টা থেকে বিবিধ সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একই জনের নামে অসংখ্য আইডি খুলে সক্রিয় হয়েছে পরাজিত শক্তির বটবাহিনী। তারা সব সময় কট্টরপন্থীদের হাইলাইটস করার মধ্য দিয়ে বিদ্যমান ক্ষোভকে উষ্কে দিতে চেষ্টা করছে। তারা পেইড পোপাগান্ডার মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাইছে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে চরমপন্থার উত্থান অনিবার্য’, যা পলাতক ফ্যাসিবাদী শক্তির পূর্বপরিকল্পিত প্রচুর অর্থলগ্নি করে সম্পাদিত ক্যাম্পেইনের অংশ। কিন্তু বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী, সুস্থ ধর্মীয় অনুশাসনে অভ্যস্ত প্রগতিশীল নাগরিক সমাজ সব ধরনের চরমপন্থী মতাদর্শের উত্থানকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সক্রিয়।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রপন্থী প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অবস্থানও এক্ষেত্রে অভিন্ন হওয়াতে ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচিত সরকার আসলে সেখানেও চরমপন্থাকে বরদাশত করা হবে না। দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদী নিষ্পেষণের মধ্যে থেকেও বাংলাদেশের গণতন্ত্রপন্থী জনগণ এমনকি তাদের নারীরাও সংগ্রাম করে গিয়েছেন একটি ন্যায়সঙ্গত, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য। তাদের এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সহনশীলতার ইতিহাসের এক অনিবার্য পরিণতি।
ঐতিহাসিক বাস্তবতায় নিউইয়র্ক টাইমসের সংবাদ যে প্যারানোইয়া সৃষ্টি করেছে তা নতুন কিছু নয়। সুলেখক ফারুক ওয়াসিম বেশ সুন্দরভাবে তুলে ধরেছিলেন বিষয়টি। তিনি লিখলেন-
‘১৮৭১ সাল: ‘আমাদের সীমান্তে বিদ্রোহীদের বসবাস’ ব্রিটিশ প্রশাসক উইলিয়াম হান্টার
১৯৭২: বাংলাদেশ এক তলাবিহীন ঝুড়ি: হেনরি কিসিঞ্জার
২০০৬ : বাংলাদেশ ইজ দ্য নেক্সস্ট আফগানিস্তান’: হিরন্ময় কার্লেকার, সেইজ পাবলিকেশন
২০০২; ‘বাংলাদেশ: আ ককুন অব টেরর’:বারটিল লিনটনার, ফার ইস্টার্ন ইকনমিক রিভিউ
২০২৫: ইজ বাংলাদেশ দ্য নেক্সস্ট আফগানিস্তান? : মাইকেল রুবিন, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট
এবং লেইটেস্ট: অ্যাজ বাংলাদেশ রিইনভেন্ট ইটসেল্ফ: ইসলামিক হার্ডলাইনার্স সি অ্যান ওপেনিং: নিউইয়র্ক টাইমস, এপ্রিল ১, ২০২৫
ওপরের একটা আশংকাও সত্যি হয়নি। হবেও না। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই ভয়কাতুরে বা প্যারানোইয়াও সত্যি হবে না। তবে হবে না মানে বসে থাকা না। বাংলাদেশ নিজস্ব আধুনিকতা নিয়েই স্বাধীন ও সার্বভৌম অবস্থানে উন্নতি করবে। কিন্তু সেটা অন্তত এক দশকের ক্লান্তিহীন মেহনতের কাজ। ইন্টারনাল ক্যাওজ সামলাতে পারলে আমরা অন্য উচ্চতায় চলে যাব। তার আগে মতবাদীক উগ্রতা এবং বিভক্তির বিষ নামাতে হবে। আগেকার লোকে শত্রুকে বান মারতো। আজকালকার যুগে গুজর রটনা হলো সেই বানমারা। এর বিরুদ্ধে বাটি চালান দিলে হবে না। সত্যিকার জনগণ হয়ে উঠতে হবে’।
বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রযাত্রা আর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর বিষয়টি বেশ প্রাচীন। মজার বিষয় হচ্ছে ফ্যাসিবাদী আমলে যখন বিএনপিকে দমন করতে কথিত ইসলামিস্টদের চরমভাবে ক্ষমতায়ন করা হচ্ছিল, ফ্যাসিস্ট নেত্রীকে কওমি জননী খেতাব দেওয়া হচ্ছিল কিংবা আহ্লাদে গদগদ হয়ে তিনি যখন ‘মদিনা সনদে’ দেশ চালানোর কথা বলছিলেন তখন উগ্রপন্থার উত্থানের সংবাদ কেউ ছাপেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যেতে থাকা বাংলাদেশের মানুষ যখন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিক্ষায় রয়েছে তখনই এসব খবর ছাপা হওয়া নিঃসন্দেহে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ভবিষ্যতে বড় রকমের সমস্যা সৃষ্টির শঙ্কা নিয়ে এখন থেকেই সতর্ক থাকা উচিত সরকারের। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর উচিত নিজেদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিষোদগার এবং কাদা নিক্ষেপ বন্ধ করে দেশকে সবরকম সাম্প্রদায়িক উষ্কানি এবং উগ্রপন্থার উত্থান থেকে রক্ষা করা। তবেই নিউইয়র্ক টাইমস সৃষ্ট এই প্যারানোইয়া থেকে মুক্তি পাবে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য যত দ্রুত সম্ভব একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের নিখোঁজ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনতে হবে।