Logo
Logo
×

বিশ্লেষণ

নির্বাচন ! সংস্কার ! নাকি গুতেরেস চান অন্য কিছু?

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৫, ১০:২৬ এএম

নির্বাচন ! সংস্কার ! নাকি গুতেরেস চান অন্য কিছু?

সম্প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিবের বাংলাদেশ সফর নিয়ে অনেকেই স্ব স্ব মতামত ব্যক্ত করেছেন। তার হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি মুখব্যাদান করে আছে দেশের প্রায় প্রতিটি দৈনিকের সামনে কিংবা পিছনের পাতায়। টিভি রিমোর্ট হাতে নিলেই দেখা যাচ্ছে তাকে। কখনও বৈঠক কিংবা মত বিনিময় করছেন নানাজনের সঙ্গে, কখনও বা সফেদ ধবধবে পাঞ্জাবি পরে অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছেন উখিয়া কুতুপালং-এর রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। আর সেখানে তার গমন সম্পর্কে কিছু কথা চাউর হয়েছে ইতোমধ্যেই। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে সফর করতে এসে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, সেনাপ্রধান আর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সাথে যে সাক্ষাৎ করেছেন সেটাই কি সব কিছু? এর বাইরে তার কি আর কিছুই বলার নেই?

বিশ্লেষকদের ধারণা গুতেরেসের সফরে সবচেয়ে গুরুত্ব বহন করছে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করতে যাওয়া। পরিদর্শনকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের উপস্থিতিতে প্রফেসর ইউনূস উপস্থিত রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্যে অনেক মূল্যবান একটি কথা বলেছেন। তবে কি তিনি অনুমান করতে পারছেন যে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে? তিনি সরাসরি বলেছেন, “এবারের ঈদটা হয়ত আপনারা নিজ ভূমিতে করতে পারছেন না, কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, আগামী ঈদ আপনারা নিজের বাড়িতেই  করতে পারবেন”

আক্কেলমান্দ বিশ্লেষকদের জন্য এই বক্তব্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আপনাদের মনে কি প্রশ্ন জাগে না জাতিসংঘ মহাসচিবের উপস্থিতিতেই প্রফেসর এই কথা কেনো বলতে গেলেন? আপনারা কি মনে করেন না যে এই কথা বলার অর্থই হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি ফিরিয়ে দিতে জাতিসংঘ এর আগেই মাঠে নেমেছে? তাদের থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই কি প্রফেসর এই ইঙ্গিত দিলেন? খুব সম্ভবত তারা বেশ আগেই কাজ শুরু করেছে। আর জাতিসংঘ কিছু করতে যাওয়া মানে তার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃসন্দেহে দাপ্তরিক সায় রয়েছে।  

তবে আরাকানে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কাজটা মোটেও সহজ হবে না। সেখানকার ৯০ শতাংশ ভূমি এখন আরাকান আর্মি তাদের দখলে রেখেছে। কিছু অংশ আরসা, আরএসওসহ বিভিন্ন বিদ্রোহী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সেখানে যা চাইবেন তা করা সম্ভব নয়। তবে এটা ঠিক যে রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত পাঠানোর জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে হিংস্র আরাকান আর্মি। এই আরাকান আর্মির সঙ্গেই কোনো আলোচনা কিংবা সমঝোতা! না বুঝে হঠাৎ মন্তব্য করা ঠিক হবে না। এমনি পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান জানাচ্ছেন, ‘বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে’ তিনি কী ধরনের যোগযোগের কথা বলেছেন সেটা স্পষ্ট হয়নি এখনও। 

ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে আরকান আর্মির সঙ্গে সখ্য বাংলাদেশের উপর একের পর এক রোহিঙ্গা শরণার্থী চাপিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে প্রভাবিত করতে পারে। আর তারই লেজ ধরে ফ্যাসিবাদ পতনের পর আরাকান আর্মির হম্বিতম্বি বেড়ে গেছে বহুগুণে। এমনকি চরম ধৃষ্টতা হিসেবে সম্প্রতি তারা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইনের বিভিন্ন এলাকা দখলও নিয়েছে। আদতে তারা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপর চাপ  দিতে চাইছে। আরাকান আর্মি প্রধান ভারত গিয়ে তাদের সেই কালাদান প্রজেক্টের পক্ষে মোসাহেবি করে এসেছে। সে হিসেবে পাঁচ আগস্টের পর তারা কাদের ইন্ধনে সীমান্তে অস্থিরতা তৈরি করেছে তা বোঝার জন্য বড় কোনো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক হওয়াটা জরুরি নয়। কিন্তু মার্কিন নির্বাচনের পর থেকে তারা আরেকদফা অন্যদিকে মোড় নিয়ে চলার চেষ্টা করেছে। 

ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সবার আগে আমেরিকা নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। তারা যেকোনো মূল্যে আরাকানে নিজেদের আধিপত্য ফিরে পেতে চায়। এমনও হতে পারে মায়ানমারের মাটিতে চীনকে চাপে রাখতে হলে নতুন কিছু করতে হবে। আর সে হিসেবে তারা রোহিঙ্গাগাদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নিতেই পারে। কারণ রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে থাকলে তাদের সব ধরনের কাজ এখানে করতে হচ্ছে। তারা চাইলেও মিয়ানমারের মাটিতে পরোক্ষ ইন্টারভেনশন করতে পারছে না। এজন্যই সেখানে তাদের পা রাখার পথ করতে হলেও রোহিঙ্গাদেরকে তাদের আবাস ভূমিতে ফেরত নিয়ে যেতে হবে। 

রোহিঙ্গারা এই মুহূর্তে আরাকানে ফিরে গেলেই জাতিসংঘকে কাজে লাগাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। কিছু না হোক, রোহিঙ্গা ক্যাম্প অনুযায়ী তারা আরাকানে নতুন মিশন খুলবে। তাদের সে মিশনের অধীনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী পাঠাতে আর কোনো বাধা থাকবে না। আনুমানিকভাবে এটা তাদের প্রথম প্রচেষ্টা হতে পারে। তবে আরাকান বাহিনীকে চাপে রাখার পাশাপাশি জাতিসংঘ মিশন খুলে বসার যে স্বপ্ন যুক্তরাষ্ট্র দেখতে পারে বলে কেউ কেউ অনুমান করছে তা নানাদিক থেকে যৌক্তিক।  

জাতিসংঘ মহাসচিবের এই সফরের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। পাশাপাশি পুরো বাংলাদেশে যে অস্থিরতা তার সঙ্গেও এর যোগসূত্র রয়েছে। বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে অনেক আলাপন  যেমন অধ্যাপক ইউনূস করেছেন পাশাপাশি আরও অনেক বক্তব্য এসেছে তার কাছ থেকে। তিনি বেশ আগেও একটা বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেছেন পরাশক্তিগুলোর সংশ্লিষ্টতার কথা। তাই চীন সফরে নতুন কোনো গ্রেট প্ল্যান সামনে রেখে আলোচনা হলেও হতে পারে। 

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ও কূটনৈতিক প্রতিবেদক রাহীদ এজাজকে দেওয়া সাক্ষাতকারে অধ্যাপক ইউনূস বলেছিলেন, ‘সার্কের জন্ম থেকে আমি এটার পেছনে আছি। আমি মনে করি যে এটাই আমাদের ভবিষ্যৎ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি এত ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব–বিভেদ থাকা সত্ত্বেও জোট করে ঘনিষ্ঠভাবে চলতে পারে, আমাদের তো ওই রকম দ্বন্দ্বের কোনো ইতিহাস নেই। আমরা কেন পারব না? একত্রে হলে আমাদের কত সুযোগ-সুবিধা বেড়ে যেত! সার্কে আমাদের ঘুরেফিরে আসতে হবে, সেটা আমরা সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছি। আমার সঙ্গে যাদের দেখা হয়েছে, তারা সবাই বলেছে, আমরা সার্ক চাই।’ প্রধান উপদেষ্টার ভবিতব্য চীন সফরের সঙ্গে এই বক্তব্যকে একটু মিলিয়ে নিন। তারপর তার ভাব সম্প্রসারণ করুন। আমার ধারণা আপনারা উত্তর পেয়ে যাবেন। 

তবে কি আগামী ঈদের আগে রোহিঙ্গারা নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে পারবেন? নাকি পারবেন না? এই প্রশ্নকে এখন বেনিফিট অব ডাউট থেকে বের করে সোজাসাপ্টা উত্তরের মধ্যে আনাটা জরুরি। ধরে রাখুন, ষাট শতাংশ সম্ভাবনা আছে তারা ফিরে যাওয়ার। আর এক্ষেত্রে তারা ফিরে যাচ্ছে নাকি যাচ্ছে না তা নির্ধারিত হবে অধ্যাপক ইউনূস চীনকে কীভাবে ম্যানেজ করতে পারেন? কতটুকু পারেন আর বিনিময়ে কী দিয়ে আসেন তার উপর। চীন সামরিক, ভৌগোলিক নাকি বাণিজ্য কোন দিক থেকে বাংলাদেশের উপর আধিপত্য চায় সেটা এই সিদ্ধান্তকে নির্ধারণ করে দিতে যথেষ্ট হবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে এটাও বলে নেওয়া যায়, আপাতত সামরিক বাদ দিয়ে বাণিজ্যকে গুরুত্ব রাখা যেতে পারে। 

আপনাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে ভারতের সংবাদমাধ্যম এনিডিটিভকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ইউনূস কী আশঙ্কার কথা বলেছিলেন। তিনি তখন স্বীকার করেছিলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা এবং যদি তা অর্জন করা না যায়, তাহলে ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে এর প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশকে কেউ অস্থিতিশীল করতে চাইলে চারদিকে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়বে। প্রতিবেশী মিয়ানমার, ভারতের সেভেন সিস্টার্স, পশ্চিমবঙ্গ সব জায়গাতেই ছড়িয়ে পড়বে অস্থিরতা।’

তাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমি ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করতে দেখলে অবাক হওয়ার কিছু নাই। এটা হবেই বলা ঠিক নয়, তবে হতে পারে বলে রাখা উচিত। আপাতত এটুকু ধরে রাখা উচিত যে রোহিঙ্গারা তাদের মাতৃভূমি আরাকানে ফিরে যাচ্ছেই। এবং খুব সম্ভবত এই কাজের আর বেশি দেরি নাই। আর এখানে এক্টিভ হয়েছে ডিপ স্টেটের গ্রেট গেইম প্ল্যান। কে জানে চীনের কী পরিকল্পনা আছে? 

বাংলাদেশের নদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে শুকিয়ে মারার যে ভারতীয় পরিকল্পনা সেখানে চীনের ভূমিকা কী হবে? ওদিকে সস্তা নানা বর্ণনা প্রতিবার যেমন শোনা যায় এবারও শুনতে পাবেন। তারা বলে যাবে, ‘জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বাংলাদেশ সফর দেশের কূটনৈতিক ও উন্নয়নমূলক অগ্রযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার মানবিক সহায়তা, অর্থনৈতিক উন্নতি, জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা এবং শান্তিরক্ষা অবদানের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।’ এর বাইরে নতুন কিছু ভাবুন। হয়তো সেদিকে তাকিয়ে থাকলে নতুন কিছু আলামত রয়েছে প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরেই। তখনই উত্তর মিলবে নানা প্রশ্নের। বিশেষত, নির্বাচন ! সংস্কার ! নাকি গুতেরেস চান অন্যকিছু? 

Logo

প্রধান কার্যালয়: ৬০৯০ ডাউসন বুলেভার্ড, নরক্রস, জর্জিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।

ই-মেইল: banglaoutlook@gmail.com

অনুসরণ করুন